বিশেষ প্রতিবেদন, ৩রা আগস্ট ২০২৬ : তৃণমূল জমানার ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ রূপ বদলে বিজেপির ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ হতেই রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভাতা পাওয়ার যে অভ্যাসে রাজ্যের কোটি কোটি মহিলা অভ্যস্ত ছিলেন, তাতেই এখন ছন্দপতন। ফলে জেলায় জেলায় পঞ্চায়েত থেকে বিডিও অফিস—কোথাও ক্ষোভের আগুন, আবার কোথাও সরকারি দপ্তরের সামনে মহিলারা নামছেন বিক্ষোভে
ভোটের আগে বিজেপির প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল—ক্ষমতায় এলে মহিলাদের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে মাসিক ৩,০০০ টাকা করা হবে এবং আগের সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্নপূর্ণা যোজনায় উন্নীত হবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরেই সুর বদলেছে নতুন সরকারের। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ঢালাও নয়, বরং সমাজভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত অভাবীদেরই এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে।এর পরই শুরু হয়েছে জটিলতা। লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদেরও নতুন করে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় আসতে ১১ পাতার দীর্ঘ অফলাইন ফরম বা জটিল অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সরকারের দাবি, গত মাসেই প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা।বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খবর অনুযায়ী, বহু মহিলার অভিযোগ:-•নতুন ফর্ম জমা দেওয়া সত্ত্বেও মাসের পর মাস বন্ধ ভাতা।- অটোমেটিক শিফট বা স্বয়ংক্রিয় রূপান্তরের কথা থাকলেও বাস্তবে পদে পদে নিয়মকানুনের কড়াকড়ি।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভাতার অনিয়মিত আগমন।
পাড়ার অলিতে-গলিতে বা চায়ের দোকানে এখন একটাই চর্চা—তৃণমূলের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বনাম বিজেপির ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। আমজনতার বড় অংশের মতে, আগে টাকার অংক ১৫০০ টাকা হলেও তা পেতেই সুবিধা ছিল এবং প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে মিলত। কিন্তু এখন ৩০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও জটিলতা।
রাজনৈতিক প্রভাব ও লোকসভা ভোটের সমীকরণ: আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে এই অসন্তোষ শাসক বিজেপি সরকারের পক্ষে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
- মহিলা ভোটব্যাংকে ধস: বাংলায় মহিলা ভোটাররা এক বিশাল নির্ণায়ক শক্তি। আর্থিক অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এই বড় ভোটব্যাংক হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
- বিরোধী তৃণমূলের বড় হাতিয়ার: বিরোধীরা ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক ইস্যু করতে শুরু করেছে। "দাবি পূরণ করতে না পেরে কড়াকড়ির অজুহাত দেওয়া হচ্ছে"—এই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তৃণমূল আক্রমণ জোরদার করছে।
- জনমানসে তুলনামূলক বিচার: দুই সরকারের কাজকর্মের তুলনা এখন সরাসরি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। আগের সরকারের সহজসরল ভাতা বনাম বর্তমান সরকারের 'শর্তসাপেক্ষ' ভাতা—এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ইভিএমে প্রভাব ফেলার প্রবল সম্ভাবনা।
সরকার কি দ্রুত এই জটিলতা কাটিয়ে উঠে উপভোক্তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারবে, নাকি এই প্রশাসনিক অব্যবস্থাই আগামী লোকসভা নির্বাচনে মোড় ঘোরানোর কারণ হবে—এখন সেটাই দেখার।
0 মন্তব্যসমূহ