পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত তারাপীঠ ভারতবর্ষের অন্যতম প্রধান সিদ্ধপীঠ। বশিষ্ট আরাধিতা তারা পীঠ আর বশিষ্ট ঋষির সঙ্গে তারাপীঠ জানতে আদি তারাপীঠ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ । কিন্তু মানুষ এর কাছে " জয় তারা জয় বাম " এই দুই নামে অনেক গভীরতা কেউ তারা মা আর তার ছেলে বামদেব এর লীলা তে মন্ত্র মুগ্ধ আবার কেউ তারা তন্ত্রের গভীর তত্ত্ব সন্ধানে নিয়োজিত। তবে তারাপীঠের আসল মাহাত্ম্য লুকিয়ে রয়েছে এখানকার ‘মহাসিদ্ধপীঠ শ্মশান’-এ। এখানকার উত্তরবাহিনী দ্বারকা নদীর তীরবর্তী শ্মশানভূমিকে তন্ত্রসাধনার জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। কথিত আছে, মহামুনি বশিষ্ঠদেব থেকে শুরু করে যুগপুরুষ সাধক বামাক্ষ্যাপা—সকলেই এই শ্মশানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তারাপীঠের গর্ভগৃহে মা তারা ‘উগ্রতারা’ বা ‘নীল সরস্বতী’ রূপে বিরাজমান। তিনি ভয়ঙ্করী হলেও ভক্তের কাছে পরম করুণাময়ী মা, যিনি জীবনের সমস্ত ঘোর বিপদ থেকে সন্তানকে ত্রাণ করেন।
সাধক বামাক্ষ্যাপা ও মা তারার অলৌকিক সম্পর্ক তারাপীঠ এবং কৌশিকী অমাবস্যার কথা বললে যাঁর নাম পরম শ্রদ্ধায় উঠে আসে, তিনি হলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা (বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়)। মা তারা এবং বামাক্ষ্যাপার সম্পর্ক প্রথাগত নিয়ম বা আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে ছিল।বামাক্ষ্যাপা শাস্ত্রীয় জটিল পুজোর বদলে মাতৃত্বের সহজ-সরল টানে মাকে ডাকতেন। তিনি মা তারাকে পাথরের বিগ্রহ নয়, বরং রূপ ধারণ করা জীবন্ত মা হিসেবে দেখতেন। কথিত আছে, মায়ের প্রসাদ তিনি আগে নিজে গ্রহণ করে তারপর মা-কে নিবেদন করতেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি নিয়মবিরুদ্ধ হলেও, এর পেছনে ছিল সন্তানের প্রতি মায়ের এবং মায়ের প্রতি সন্তানের পরম বাৎসল্য প্রেম।এই কৌশিকী অমাবস্যার তিথিটিই ছিল সাধক বামাক্ষ্যাপার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লগ্ন। ভাদ্র মাসের এই বিশেষ রজনীতেই তারাপীঠের শ্মশানে শ্বেতশিমুল বৃক্ষের নিচে সাধনায় বসে তিনি দেবী তারার প্রত্যক্ষ দর্শন ও মহাসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।কৌশিকী অমাবস্যা কেবল একটি তিথি নয়, এটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের এক প্রতীকী যাত্রা। তারাপীঠের বাতাস আজও মা তারা এবং সাধক বামাক্ষ্যাপার সেই অপার্থিব মাতৃ-স্নেহ ও ভক্তির স্মৃতি বহন করে চলেছে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই পুণ্য তিথিতে শুদ্ধ মনে তারা মায়ের চরণে আত্মসমর্পণ করলে জীবনের সকল বাধাবিঘ্ন দূর হয় এবং অন্তরে পরম শান্তির সঞ্চার ঘটে।
0 মন্তব্যসমূহ