রাজ্যের একাধিক জায়গায় যখন সরকারি আর্থিক অনুদানের তাগিদে পারিবারিক পূজাকে 'সার্বজনীন' আখ্যা দিয়ে ঐতিহ্য বদলের এক অসম প্রতিযোগিতা চলছে, ঠিক তখনই বীরভূমের রামপুরহাট ১ নম্বর ব্লকের খরুন গ্রামে দেখা গেল এক ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণা দায়ক ছবি। তারাপীঠ সংলগ্ন এই খরুন গ্রামের শতাব্দী প্রাচীন চ্যাটার্জী বাড়ির পারিবারিক দুর্গোৎসব আজও নিজের প্রাচীন ঐতিহ্য, ঐতিহ্যবাহী তান্ত্রিক ধারা এবং পরিবারের প্রতিটি শরিকের আন্তরিক ভক্তিতে উজ্জ্বল।রাজনৈতিক পালাবদল কিংবা সরকারি সাহায্যের প্রলোভন—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই পরিবারের নিষ্ঠাকে বিগত কংগ্রেস, বাম, তৃণমূল থেকে বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলেও অর্থ নয় ভক্তি ও পরিবারিক ভক্তি ও আস্থাতেই ভরসা সনাতনী হিন্দু এই চ্যাটার্জী পরিবারের । দূর্গা মন্দিরের মূল দরজার উপরের অংশে মন্দিরের চারজন শরিকের উল্লেখ থাকলেও মূলত তিনটি শরিক পরিবার সব প্রতিকূলতা জয় করে শতাব্দী ধরে ধরে রেখেছেন মায়ের এই আবাহন এর জন্যে পূজার পালি অর্থাৎ পূজা পরিচালনা। কিন্তু এই দুর্গোৎসবে চার শরিকের পরিবার ই পূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গনে উপস্থিত হয়।
ঐতিহ্য ও তন্ত্রসাধনার ইতিহাস:
খরুন গ্রামের এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক গূঢ় আধ্যাত্মিক ইতিহাস। একদা বীরভূমের এই তন্ত্রপীঠ সংলগ্ন এই গ্রামে বিশিষ্ট তান্ত্রিক শ্রী শ্রী কালিকানন্দ তীর্থনাথ ( স্বর্গীয় সাধন চ্যাটার্জি) —যিনি ছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপার (বামদেব) মানসপুত্র পরমপূজ্য শ্রী শ্রী জ্ঞানানন্দ গোস্বামী (জ্ঞানবাবা)-র বিশেষ প্রিয় ও আশীর্বাদধন্য শিষ্য— এছাড়া ও স্বর্গীয় আনন্দ গোপাল চ্যাটার্জি, সত্য সাধন চ্যাটার্জি সহ এই চ্যাটার্জী পরিবারের একাধিক পূর্ব পুরুষ দের বামদেবের মানস পুত্র জ্ঞানানন্দ গোস্বামী বাবা বিভিন্ন নামে সম্বোধন করতেন। স্বর্গীয় কালিকানন্দ তীর্থনাথ / লভ্য বাবা ( স্বর্গীয় সাধন চ্যাটার্জী ) এর পিতা স্বর্গীয় দোলগোবিন্দ চ্যাটার্জি ও তার পূর্ব পুরুষরা কোন না কোন সমযে শক্তি আরাধনার ও তন্ত্রসাধনার সুবাদে এবং তন্ত্র ও শক্তি পূজার প্রভাবের ছোঁয়া লেগেছিল এই পরিবারের পূজায়। সেই প্রাচীন তান্ত্রিক ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠান আজও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।
সেকাল ও একালের মেলবন্ধন:
এই পূজার অন্যতম মূল শক্তি হলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের মেলবন্ধন। পরিবারের বয়োবৃদ্ধ শরিক আসি উর্দ্ধ প্রশান্ত চ্যাটার্জী ও সত্তর+ ঊর্ধ্ব প্রাক্তন শিক্ষক লালি চ্যাটার্জীর (মাস্টারমশাই) অভিজ্ঞ দিকনির্দেশনায় যেমন পূজা পরিচালিত হয়, তেমনই নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি—লোকনাথ মুখার্জি, হীরক ভট্টাচার্য, রত্নদীপ চ্যাটার্জি এবং অনুপম চ্যাটার্জীদের মতো 'জেন জি' (Gen Z) যুবকরাও সমানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পূজার সমস্ত কাজ সামলাচ্ছেন।পূজা পরিচালনার দায়িত্বে যেমন আছেন মহুয়া চ্যাটার্জী, ফ্যান্সি মুখার্জী, সংগীতা চ্যাটার্জী, চঞ্চলা চ্যাটার্জী, প্রতিমা চ্যাটার্জি,শ্যামা সাধন চ্যাটার্জী, কুশল চ্যাটার্জী, ও স্বর্গীয় আনন্দ গোপাল চ্যাটার্জীর পুত্র অপু চ্যাটার্জীর মতো একাধিক শরিক তেমনি তাঁদের মধ্যে থাকা শরিক স্বর্গীয় সাধন চ্যাটার্জীর কন্যা সুলেখা ভট্টাচার্য, স্বর্গীয় অমিয় চ্যাটার্জীর পুত্র ভাস্বত চ্যাটার্জী এবং স্বর্গীয় মদন মুখার্জির পরিবারের দেবল মুখার্জি দের মতো শরিকদের স্পষ্ট বার্তা বেঙ্গল লেন্স পত্রিকাকে —"এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া শত বছরের পুণ্যি। সরকারি অনুদান বা কোনো বাহ্যিক সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে, সমস্ত শরিকরা একত্রিত হয়ে নিজেদের সামর্থ্য ও ভক্তি দিয়েই মায়ের পূজা চালিয়ে আসছি এবং ভবিষ্যতেও আসব।"
হেরিটেজ স্বীকৃতির দাবি:
আজকের দিনে যেখানে বহু প্রাচীন পারিবারিক পূজা অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পড়ে সার্বজনীনতার রূপ নিচ্ছে, সেখানে খরুন গ্রামের চ্যাটার্জী বাড়ির এই পূজা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, জাঁকজমক ও প্রচারের আলোয় থাকা আধুনিক পূজার পাশাপাশি, খাঁটি সনাতনী ধারা ও ঐতিহ্য রক্ষা করে চলা শতাব্দী প্রাচীন এই গ্রামীণ পারিবারিক পূজাকে কি রাজ্য বা কেন্দ্র সরকার 'হেরিটেজ পূজা'-র মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করবে?
আধুনিকতার ভিড়েও চ্যাটার্জী পরিবার প্রমাণ করে দিয়েছে—সংস্কৃতি, ভক্তি এবং পারিবারিক একতা কেনাবেচার বস্তু নয়, তা লালন করার বিষয়।
আগামী দিনে এই পারিবারিক শতাব্দী প্রাচীন পূজার বিষয়ে সরকার কী চিন্তা করছে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করবো।
0 মন্তব্যসমূহ